জাতীয়

হাসপাতালের মেঝেতেও ঠাঁই নেই

সাইরেন বাজিয়ে এম্বুলেন্স এলো ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে। গাড়ির ব্যাকডালা খুলতেই দেখা যায় মধ্যবয়স্ক এক লোকের হাতে ক্যানোলা লাগানো, নাম মো. আরিফ। পাশে স্ত্রী বাতাস করছেন। ছেলে কাগজ নিয়ে তড়িঘড়ি ছুটলেন হাসপাতালের ভিতরে। স্ত্রী রাহেলা বলেন, এক সপ্তাহ থেকে জ্বর। তিন ব্যাগ প্লাটিলেট দিয়েছি। তারপরও প্লাটিলেট বাড়ছে না। বুধবার রাতে শেষ রিপোর্টে দেখা যায় প্লাটিলেট নেমে আসছে ৪০ হাজারে। কুমিল্লা হাসপাতাল থেকে বলেছে, দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যেতে। কিছু সময় পর ছেলে অনুমতিপত্র নিয়ে এলেন।সঙ্গে হুইল চেয়ার। লিফটে নিয়ে যাওয়া হলো ৬ তালায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে আবার বিপত্তি। মেঝেতেও আসন নেই। হাঁটার পথের পাশে বিছানা পাতার চেষ্টা করা হলেও মিললো না সুফল। এরপর সুজন নামে এক ব্যক্তি ওয়ার্ডের করিডরে স্থান করে দিলেন। তার ছেলে আরাফাত হোসেন জিকো বলেন, বাবার শরীর একেবারে ভেঙে পড়েছে। বাবা এর আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেলে ৮ দিন ভর্তি ছিলেন। এবার আবার নিয়ে আসতে হলো এখানেই। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে টিকে থেকে সেবা নেয়াটা একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়। আপনাকে জায়গা বুঝে অর্থ খরচ করতে হবে। আর রোগীর চাহিদা এত বেশি যে সেবাটা আদায় করে নিতে হয়। জিকোর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই আরেকজন রোগী আসেন সেখানে। তিনি কোনোরকম একটু চাদর পেতে শুয়ে পরলেন। ঠিকমতো পা মেলেও শুতে পারলেন না। অন্য এক রোগী চলে যাবেন। সেই রোগীর চলে যাওয়ার অপেক্ষায় রইলেন তার স্বজনরা। চিত্রটা গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের। ৬ জন রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সকলেই এসেছেন ঢাকার বাইরে থেকে। তিনদিন ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ভর্তি মো. ইসমাইল হোসেন। তিনি নরসিংদী পলাশ উপজেলার বাসিন্দা ও একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ক্যানোলা লাগানো অবস্থায় তিনি বলেন, স্কুলে ছেলেমেয়েদের ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচার জন্য নিয়মিত উপদেশ দিতাম। স্কুল ও এর আশেপাশে পরিষ্কার করলাম কিন্তু আমারই ডেঙ্গু হলো। তিনি বলেন, এই রোগটি খুবই বাজে একটি রোগ। সবসময় ভয়ে থাকতে হয়। কারণ এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা করানো হলেও চিকিৎসা ব্যয়ে নাজেহাল অবস্থায় পড়েছেন রোগী ও স্বজনরা। গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন শরিফ ও আলেয়া দম্পতি। তাদের একমাত্র ছেলে ৮ দিন ধরে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি। শরিফ বলেন, এই ক’দিনে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিদিন সিবিসি টেস্ট করাতে হয়। এই পরীক্ষার খরচ চারশ’ টাকা হলেও ফল পেতে অনেক দেরি হয়। বড় লাইনে দাঁড়ানো লাগে। তাই একটি বেসরকারি হাসপাতালের লোকজন ঘোরাঘুরি করে। তারা সাতশ’ টাকা দিলে রক্ত নিয়ে যায়। তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে এসে রিপোর্ট দিয়ে যায়। তার বাচ্চার এক ব্যাগ প্লাটিলেট দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকায় আমি কাউকে চিনি না। কাকে কি বলবো। এরপর ব্লাড ব্যাংকের সামনে এক লোক এক ব্যাগ প্লাটিলেটের ব্যবস্থা করলেন। ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে তাকে।আব্দুর রহমান নামে এক রোগীর স্বজন মেডিকেলের বাইরে বসে ছিলেন। মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন, চাইছিলেন টাকা ধার। তিনি জানান, তার ছেলে থাকে সৌদি আরব। ছেলের বউ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। এরপর ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পর পজেটিভ আসে। তিনি বলেন, দুইদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। ভর্তির পর প্রথম দিনেই আমার ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। এরপর ডাক্তার বলছেন, প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খাওয়াতে। প্রতিদিন নাকি টেস্ট করাতে হয়। হাতে ২০ হাজার টাকা নিয়ে আসছিলাম। এখন টাকা প্রায় শেষ। ছেলে কোনো এক কারণে টাকা পাঠাতে পারছে না। সে বলে শনিবার টাকা পেয়ে যাবো। কিন্তু এখানে হাসপাতালে প্রতিদিন যা বুঝলাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হবে। এক ব্যাগ রক্ত ও এক ব্যাগ প্লাটিলেট দেয়া লাগছে। ডাক্তার বলেছেন, আরও লাগতে পারে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরীক্ষা করাচ্ছেন বাইরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে। হাসপাতালের বাইরে বসেছে বেশ কয়েকটি ডাবের দোকান। তাদের বিক্রিও বেশ। পলিথিনে করে পাইপ দিয়ে দিচ্ছেন ডাবের পানি। স্কুল পড়ুয়া ছেলের জন্য ডাব কিনছিলেন আমিনুর রহমান। তিনি বলেন, ডেঙ্গু পজেটিভ আসার পরও ছেলেকে বাসায় রেখেই চিকিৎসা করাচ্ছিলাম। আমার বড় বোন একটি বেসরকারি নার্সিং কলেজের শিক্ষক। তার পরামর্শ মতো প্রচুর তরল খাবার খাওয়াই। কিন্তু এরপরও প্লাটিলেট ড্রপ করায় তার পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়।তিনি বলেন, প্রথম দিনে মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর প্রথম দিনেই সাড়ে ৬ হাজার টাকা বিল করে। এরমধ্যে দুই হাজার টাকা সিট ভাড়া। রাতে ছেলের জ্বর বাড়তে থাকে। কিন্তু রাতে নার্স ছাড়া কোনো ডাক্তার ছিল না। সাপোজিটর দিয়েও জ্বর কমছিল না। তাই পরদিন সকালে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি। এখানে সেবার মান খারাপ হলেও ডাক্তার পাওয়া যায়। পরামর্শ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সবমিলিয়ে তার ৫ দিনে ঢাকা মেডিকেলে প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা চিকিৎসার পেছনে খরচ হচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button